ঢাকা ১২:৪৮ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬, ১১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম
হাজীগঞ্জে এতিমদের জন্য বরাদ্দ গেলো ইউপি সদস্যের পকেটে ই-পাসপোর্টের দীর্ঘ ভোগান্তির পর বিশেষ কনস্যুলার সেবা, স্বস্তিতে ফ্রান্সপ্রবাসীরা গাইবান্ধায় র‍্যাবের অভিযানে ১,২৭০ পিস ইয়াবাসহ মাদক কারবারি গ্রেপ্তার দীর্ঘ দেড় বছরেও ইতালি বিএনপির কমিটি পুনর্গঠন না হওয়ায় সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন প্রস্তাবিত আহ্বায়ক কমিটি জয়পুরহাটে অটোরিকশা শ্রমিক মাহমুদুল হাসান হত্যার প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন মীরসরাইয়ে জমি বিরোধের জেরে হামলা-লুটপাট: সংবাদ সম্মেলনে ভূক্তভোগী পরিবারের বিচার দাবি ই-পাসপোর্টের দীর্ঘ ভোগান্তির পর বিশেষ কনস্যুলার সেবা, স্বস্তিতে ফ্রান্সপ্রবাসীরা নয়দুয়ারী মাদ্রাসার সভাপতি নির্বাচিত লায়ন মনিরুল ইসলাম ইউচুপকে সংবর্ধনা দুবাই বাংলাদেশ কনস্যুলেটে সমন্বিত কিউ ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম চালু, দ্রুত মিলবে পাসপোর্ট ও কনস্যুলার সেবা রামগঞ্জে ৫ বছরের শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার ৭০ বছরের বৃদ্ধ আটক

গ্রামীণ শিক্ষায় নতুন দিগন্ত: টিম শংকরপুরের ব্যতিক্রমী উদ্যোগ

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১০:১৪:৪৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
  • ৫৬ বার

মোসাদ্দেক হোসেন জুয়েল :

চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলার শংকরপুর গ্রামে একদল স্বপ্নবাজ তরুণের হাত ধরে গড়ে ওঠা সামাজিক সংগঠন টিম শংকরপুর শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধভিত্তিক সমাজ গঠনে নীরবে কাজ করে যাচ্ছে। বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যের বাইরে সম্পূর্ণ সেবামূলক মানসিকতা নিয়ে পরিচালিত সংগঠনটির শিক্ষামূলক কার্যক্রম ইতোমধ্যে এলাকাবাসীর মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।

২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে টিম শংকরপুরের উদ্যোগে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে সন্ধ্যাকালীন একাডেমিক রিডিং রুম। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এটি গ্রামের শিক্ষার্থীদের জন্য একটি নিরাপদ ও নিয়মতান্ত্রিক শিক্ষা পরিবেশ নিশ্চিত করে আসছে। বিদ্যালয়ের পাঠের পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা এখানে প্রতিদিন নির্ধারিত সময়ে এসে পড়াশোনা, বাড়ির কাজ সম্পন্ন, বিষয়ভিত্তিক দুর্বলতা দূরীকরণ এবং পরীক্ষার প্রস্তুতির সুযোগ পাচ্ছে।

বর্তমানে রিডিং রুমে তিনজন শিক্ষক আন্তরিকতার সঙ্গে পাঠদান করছেন। তাঁদের তত্ত্বাবধানে শিক্ষার্থীরা শুধু পাঠ্যবইভিত্তিক জ্ঞানই নয়, বরং শৃঙ্খলা, সময়ানুবর্তিতা, পরিচ্ছন্নতা ও নৈতিক শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও দিকনির্দেশনা পাচ্ছে।

প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি মজবুত করার লক্ষ্যে টিম শংকরপুর প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বাংলা, ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে নিয়মিত ক্লাসের পাশাপাশি সাপ্তাহিক পাঠ পরিকল্পনা, অনুশীলন শিট, ক্লাস টেস্ট, মৌখিক মূল্যায়ন এবং ধারাবাহিক অগ্রগতি মূল্যায়নের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে অতিরিক্ত সহায়তা ও বিশেষ পরিচর্যার সুযোগ।

শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে সংগঠনটি একটি প্রক্টোরিয়াল টিম গঠন করেছে। এই টিম নিয়মিত ক্লাস পর্যবেক্ষণ, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও শৃঙ্খলা তদারকি, পাঠদানের মান মূল্যায়ন এবং পরীক্ষা পরিচালনার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কাজ করছে। এর ফলে শিক্ষা কার্যক্রমে জবাবদিহিতা ও মান নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী হয়েছে।

সংগঠনটির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো অভিভাবকদের সক্রিয় সম্পৃক্ততা। নির্দিষ্ট সময় পরপর অভিভাবক সভার আয়োজন করে শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি তুলে ধরা হয় এবং তাদের করণীয় সম্পর্কে পরামর্শ দেওয়া হয়। এতে পরিবার ও শিক্ষকদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে উঠেছে, যা শিক্ষার্থীদের সার্বিক উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।

টিম শংকরপুরের শিক্ষা কার্যক্রম শুধু পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষার্থীদের মধ্যে সততা, সামাজিক দায়বদ্ধতা, দেশপ্রেম, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তুলতে বিভিন্ন সচেতনতামূলক আলোচনা, দলীয় কার্যক্রম এবং অনুপ্রেরণামূলক সেশন পরিচালনা করা হয়। সংগঠনটির বিশ্বাস, একটি শিক্ষিত সমাজ গড়তে হলে নৈতিক শিক্ষার বিকল্প নেই।

এছাড়াও সংগঠনটি নিয়মিত মাসিক মূল্যায়ন, মৌখিক পরীক্ষা, মেধা যাচাই এবং ফলাফল বিশ্লেষণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করছে। ভালো ফলাফল অর্জনকারী শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করা এবং পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সহায়তার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

টিম শংকরপুরের সদস্যরা জানান, ভবিষ্যতে একটি সমৃদ্ধ পাঠাগার প্রতিষ্ঠা, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা কার্যক্রম, দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা সহায়তা, ক্যারিয়ার গাইডলাইন এবং দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

স্থানীয় অভিভাবক ও সচেতন মহলের মতে, গ্রামীণ পর্যায়ে সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে পরিচালিত এমন উদ্যোগ খুবই বিরল। টিম শংকরপুরের প্রচেষ্টায় অনেক শিক্ষার্থীর পড়াশোনায় আগ্রহ বেড়েছে, নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বৃদ্ধি পেয়েছে এবং অভিভাবকদের মধ্যেও শিক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে নতুন করে সচেতনতা তৈরি হয়েছে।

শিক্ষাকে কেন্দ্র করে একটি আলোকিত, সুশৃঙ্খল ও মানবিক সমাজ গড়ে তোলার যে স্বপ্ন নিয়ে টিম শংকরপুর পথচলা শুরু করেছে, তা ইতোমধ্যে আশাব্যঞ্জক সাফল্যের ইঙ্গিত দিচ্ছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা পেলে এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে আরও বৃহৎ পরিসরে বিস্তৃত হবে এবং গ্রামীণ শিক্ষার উন্নয়নে একটি অনুসরণীয় মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আলোচিত

হাজীগঞ্জে এতিমদের জন্য বরাদ্দ গেলো ইউপি সদস্যের পকেটে

গ্রামীণ শিক্ষায় নতুন দিগন্ত: টিম শংকরপুরের ব্যতিক্রমী উদ্যোগ

আপডেট টাইম : ১০:১৪:৪৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬

মোসাদ্দেক হোসেন জুয়েল :

চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলার শংকরপুর গ্রামে একদল স্বপ্নবাজ তরুণের হাত ধরে গড়ে ওঠা সামাজিক সংগঠন টিম শংকরপুর শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধভিত্তিক সমাজ গঠনে নীরবে কাজ করে যাচ্ছে। বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যের বাইরে সম্পূর্ণ সেবামূলক মানসিকতা নিয়ে পরিচালিত সংগঠনটির শিক্ষামূলক কার্যক্রম ইতোমধ্যে এলাকাবাসীর মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।

২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে টিম শংকরপুরের উদ্যোগে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে সন্ধ্যাকালীন একাডেমিক রিডিং রুম। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এটি গ্রামের শিক্ষার্থীদের জন্য একটি নিরাপদ ও নিয়মতান্ত্রিক শিক্ষা পরিবেশ নিশ্চিত করে আসছে। বিদ্যালয়ের পাঠের পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা এখানে প্রতিদিন নির্ধারিত সময়ে এসে পড়াশোনা, বাড়ির কাজ সম্পন্ন, বিষয়ভিত্তিক দুর্বলতা দূরীকরণ এবং পরীক্ষার প্রস্তুতির সুযোগ পাচ্ছে।

বর্তমানে রিডিং রুমে তিনজন শিক্ষক আন্তরিকতার সঙ্গে পাঠদান করছেন। তাঁদের তত্ত্বাবধানে শিক্ষার্থীরা শুধু পাঠ্যবইভিত্তিক জ্ঞানই নয়, বরং শৃঙ্খলা, সময়ানুবর্তিতা, পরিচ্ছন্নতা ও নৈতিক শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও দিকনির্দেশনা পাচ্ছে।

প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি মজবুত করার লক্ষ্যে টিম শংকরপুর প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বাংলা, ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে নিয়মিত ক্লাসের পাশাপাশি সাপ্তাহিক পাঠ পরিকল্পনা, অনুশীলন শিট, ক্লাস টেস্ট, মৌখিক মূল্যায়ন এবং ধারাবাহিক অগ্রগতি মূল্যায়নের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে অতিরিক্ত সহায়তা ও বিশেষ পরিচর্যার সুযোগ।

শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে সংগঠনটি একটি প্রক্টোরিয়াল টিম গঠন করেছে। এই টিম নিয়মিত ক্লাস পর্যবেক্ষণ, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও শৃঙ্খলা তদারকি, পাঠদানের মান মূল্যায়ন এবং পরীক্ষা পরিচালনার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কাজ করছে। এর ফলে শিক্ষা কার্যক্রমে জবাবদিহিতা ও মান নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী হয়েছে।

সংগঠনটির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো অভিভাবকদের সক্রিয় সম্পৃক্ততা। নির্দিষ্ট সময় পরপর অভিভাবক সভার আয়োজন করে শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি তুলে ধরা হয় এবং তাদের করণীয় সম্পর্কে পরামর্শ দেওয়া হয়। এতে পরিবার ও শিক্ষকদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে উঠেছে, যা শিক্ষার্থীদের সার্বিক উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।

টিম শংকরপুরের শিক্ষা কার্যক্রম শুধু পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষার্থীদের মধ্যে সততা, সামাজিক দায়বদ্ধতা, দেশপ্রেম, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তুলতে বিভিন্ন সচেতনতামূলক আলোচনা, দলীয় কার্যক্রম এবং অনুপ্রেরণামূলক সেশন পরিচালনা করা হয়। সংগঠনটির বিশ্বাস, একটি শিক্ষিত সমাজ গড়তে হলে নৈতিক শিক্ষার বিকল্প নেই।

এছাড়াও সংগঠনটি নিয়মিত মাসিক মূল্যায়ন, মৌখিক পরীক্ষা, মেধা যাচাই এবং ফলাফল বিশ্লেষণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করছে। ভালো ফলাফল অর্জনকারী শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করা এবং পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সহায়তার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

টিম শংকরপুরের সদস্যরা জানান, ভবিষ্যতে একটি সমৃদ্ধ পাঠাগার প্রতিষ্ঠা, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা কার্যক্রম, দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা সহায়তা, ক্যারিয়ার গাইডলাইন এবং দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

স্থানীয় অভিভাবক ও সচেতন মহলের মতে, গ্রামীণ পর্যায়ে সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে পরিচালিত এমন উদ্যোগ খুবই বিরল। টিম শংকরপুরের প্রচেষ্টায় অনেক শিক্ষার্থীর পড়াশোনায় আগ্রহ বেড়েছে, নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বৃদ্ধি পেয়েছে এবং অভিভাবকদের মধ্যেও শিক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে নতুন করে সচেতনতা তৈরি হয়েছে।

শিক্ষাকে কেন্দ্র করে একটি আলোকিত, সুশৃঙ্খল ও মানবিক সমাজ গড়ে তোলার যে স্বপ্ন নিয়ে টিম শংকরপুর পথচলা শুরু করেছে, তা ইতোমধ্যে আশাব্যঞ্জক সাফল্যের ইঙ্গিত দিচ্ছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা পেলে এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে আরও বৃহৎ পরিসরে বিস্তৃত হবে এবং গ্রামীণ শিক্ষার উন্নয়নে একটি অনুসরণীয় মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।